পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতিতে সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৫-০৩-২০২৬ ০৯:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৫-০৩-২০২৬ ০৯:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন
জাতীয় সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গুরুতর গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। তাদের তদারকি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণেই কোটি টাকার নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম অধিবেশনেই অচল হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের। বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশাসনিক মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত বিপর্যয়কে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পাঁচ প্রকৌশলী হলেন—গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম। সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় সংসদের নতুন সাউন্ড সিস্টেম কার্যত প্রথম দিনেই বিকল হয়ে পড়ে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ করেই সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। স্পিকার মাইকে কথা বললেও তা স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন স্পিকার। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়। এ সময় প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, সংসদের জন্য নতুন এই সাউন্ড সিস্টেমটি প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সংসদের অধিবেশন আরও কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবহারের প্রথম দিনেই পুরো সিস্টেম অচল হয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রযুক্তিগত মান যাচাই এবং তদারকি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি যন্ত্রাংশ ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সাউন্ডের মান কেমন, পুরো সিস্টেমের সমন্বয় ঠিক আছে কি না—এসব বিষয় বারবার যাচাই করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই ধরনের নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা আদৌ করা হয়েছিল কি না তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংসদ ভবনের মতো উচ্চ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থাপনায় নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে সাধারণত অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ত্রুটি আগে থেকেই শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় সমাধান নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই নতুন সাউন্ড সিস্টেমটি ব্যবহারে আনা হয়। ফলে প্রথম দিনেই এতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং পুরো ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাউন্ড সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে ‘আমানত এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এই কাজের দায়িত্ব পেল, তাদের সরঞ্জামের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে কি না, এবং সরঞ্জাম সরবরাহের আগে যথাযথ কারিগরি যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, যথাযথ কারিগরি মূল্যায়ন ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি নাও হতে পারত।
এদিকে সংসদ সদস্যদের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হেডফোনের ছবি পোস্ট করে অভিযোগ করেছেন যে সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। তিনি দাবি করেন, হেডফোন ব্যবহার করতে গিয়ে তার কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে এবং সাউন্ড কোয়ালিটিও খুবই খারাপ। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেনা সরঞ্জামের মান যদি এমন হয়, তবে তা সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অভিযোগ রয়েছে, সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন, পরীক্ষা এবং পরিচালনার প্রতিটি ধাপেই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সক্রিয় তদারকি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দায়িত্ব পালনে অবহেলা, সমন্বয়ের অভাব এবং যথাযথ নজরদারির ঘাটতির কারণেই পুরো সিস্টেম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং এর ফলে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের নাম। কারণ এর আগেও তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সংসদ ভবনে প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছিল। জানা গেছে, ২০১৮ সালে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময়ও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এত বড় একটি ঘটনার পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বারবার একই ধরনের সমস্যা ঘটলেও কেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, সংসদ ভবনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। অনেক সময় দেখা যায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার চেয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন না হয়ে অন্য বিবেচনায় অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়।
এদিকে আরও একটি বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক কয়েক মাস পর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা সত্ত্বেও তিনি বিদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রয়েছে তার। এতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলমসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এই প্রশিক্ষণের বিষয় হচ্ছে এইচভিএসি বা হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ। সাধারণত এই ধরনের প্রশিক্ষণ মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিবিদদের জন্য বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মকর্তারাও এই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এই প্রশিক্ষণ আদৌ প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে, নাকি এটি কেবল বিদেশ সফরের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিটি যন্ত্রপাতি স্থাপন থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুতে সর্বোচ্চ মানের পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে মনে হচ্ছে সেই পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর মান আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত। কারণ সংসদের প্রতিটি কার্যক্রম দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেয়।
এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে যদি গাফিলতি, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার কোনো বিষয় থেকে থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সেজন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স